কফি আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় হলেও এক দশক আগেও এতো বেশি কফি পানের রেওয়াজ আমাদের দেশে ছিল না। ইনস্ট্যান্ট কফির আগমনে কেউ কেউ শখ করে পান করতেন।
কফি সম্পর্কে জানার আগে এর আবিষ্কারের ইতিহাস একটু জেনে নেয়া যাক
কফির ইতিহাস
ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, নবম শতকে ইথিওপিয়ায় কালদি নামে এক ছাগল পালক তার ছাগলদের বেরি জাতীয় গাছ থেকে প্রথম ফল খেতে দেখেন। পরে তিনি খেয়াল করেন, তার ছাগলগুলো না ঘুমিয়েই সারারাত জেগে আছে। এ কথা যখন একদল সন্ন্যাসীকে জানান, তখন তারা ঐ ফল থেকে এক প্রকার তরল অর্থাৎ পানীয় তৈরি করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রার্থনা করার জন্য সারারাত জেগে থাকা। আর এভাবেই আবিষ্কার হয় জনপ্রিয় এ পানীয়টি। যা পরবর্তীতে কফি নামে পরিচিতি লাভ করে।
কফির উৎপাদন
কফি উৎপাদনে ব্রাজিলের অবস্থান তালিকার শীর্ষে। বিশ্বব্যাপী কফি সরবরাহে ব্রাজিল থেকে আসে ৪০ শতাংশ। আর ভিয়েতনাম হল দ্বিতীয়। প্রায় ২০ শতাংশ কফি সরবরাহ হয় এখান থেকে। তবে ইথিওপিয়ান কফিকে, বিশ্বে মানের দিক থেকে সেরা বলা যায়।
কফি আসলে কি
এক ধরনের চেরি ফল যার বীজগুলো চোলাই করে তৈরি করা হয় কফি। অর্থাৎ চেরি ফলের রোস্ট করা বীজ।
আমরা সবসময়ে একটা কথা জেনে আসছি, কফি পান করতে হয়। কিন্তু কোথাও কোথাও মানুষ কফি ফল খেতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বেশি। কফি যেহেতু এক ধরনের চেরি ফল সেহেতু এটা খাওয়া যেতেই পারে, এই ফলটিতে কামড় দিলেই গোলাকার আকারের বীজটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
জাতীয় কফি সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য মতে, বিশ্বের ৫% কফিতে ‘পিবেরি’ নামক একটি বীজই থাকে। সম্পূর্ণ হাতে আলাদা করা হয় এই ‘পিবেরি’। কড়া স্বাদ এবং চমৎকার মিশ্রণের জন্য এই ধরনের কফি বীজ বিখ্যাত।
কফি স্বাদের দিক থেকে কেমন
কফি আসলে মিষ্টি মেটে আর পোড়া স্বাদযুক্ত। এই স্বাদই শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করে খুব অল্প সময়ে। তাই এটি পানে শরীরে ও মনে এক চনমনে ভাব এসে যায়।
কফির প্রচলন এখন শুধু বাড়িতে নয়, মিলছে পথেঘাটে। আর কফির জন্য তো কফিশপ আছেই। কফি পানের পরিমাণ সারা পৃথিবীতে গড়ে প্রায় ২.২৫ বিলিয়ন কাপ। তবে এই কফি স্বাদের দিক থেকে যেমন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয় তেমনি এর প্রস্তুত প্রণালিতেও রয়েছে ভিন্নতা।
বিভিন্ন ধরনের কফি
কফির এই বীজটা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে- অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা। অ্যারাবিকা বলা হয় ইথিওপিয়ায় উৎপন্ন গাছ থেকে পাওয়া কফিকে। সাধারণত এই ধরনের কফি মিহি, হালকা এবং সুবাসযুক্ত হয়ে থাকে। এই জাতের কফির দাম অপেক্ষাকৃত বেশি এবং ৭০% কফিই বিশ্বের প্রায় ইথিওপিয়ান জাতের।
আর রোবাস্টা কফি স্বাদের দিক থেকে কিছুটা তিতকুটে এবং ক্যাফেইনের মাত্রা বেশি। সাধারণত ইন্সট্যান্ট কফি তৈরিতে এই ধরনের কফি বেশি ব্যবহার করা হয়।
এছাড়াও মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অল্প কিছু এলাকায় এবং ব্রাজিলেও এধরণের কফি জন্মায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি
শুনলে অবাক হবেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি সম্পর্কে। এর উৎপাদনের পদ্ধতিও একেবারে ভিন্ন। যেটা জানলে আপনারা অনেকেই খেতে চাইবেন আবার আপনাদের কারো কারো বমি চলে আসতে পারে। ‘সিভেট’ নামের এক প্রজাতির বিড়াল আর এক ধরনের হাতি,যাদের পরিপাকতন্ত্র হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছায় এই মূল্যবান কফি।
ইন্দোনেশিয়ান এই সিভেট বিড়ালের বিষ্ঠা থেকে তৈরি হয় কোপি লুয়াক (Kopi luwak) নামক কফি। কফির চেরিগুলো যখন বিড়ালের পরিপাকতন্ত্র দিয়ে যায় তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে গাঁজন হয়। এর ফলে এক বিশেষ সুগন্ধ যোগ হয় কফি বিনের সাথে। যা পরবর্তীতে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রির জন্য সংগ্রহ করা হয়। ১৪০০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা) পর্যন্ত হতে পারে এ ধরণের কফির এক কেজির দাম।

তবে বর্তমানে ব্ল্যাক আইভরি কফি ‘কোপি লুয়াক’ কে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলছে। এই জাতের বাছাই করা কফির বীজ থাইল্যান্ডের হাতিদের আলাদা করে হাতে খাওয়ানো হয়। এরপর তাদের বিষ্ঠা থেকে সংগৃহীত চেরি থেকে তৈরি হয় তীব্র গন্ধযুক্ত কফি ।
এক ধরনের কফি তৈরির পর নষ্ট হয়ে যাওয়া বা উচ্ছিষ্টাংশ চেরি দিয়ে বিভিন্ন কফি তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ময়দা তৈরি করে। রুটি, চকলেট, সস বা কেক তৈরিতে এই ময়দা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে এর স্বাদ বীজের জাতের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়ে থাকে।
ব্ল্যাক আইভরি কফি আবিষ্কার করেছিলেন ব্লেক ডিঙ্কিন নামে এক কানাডিয়ান। এ কফির ৩৫ গ্রামের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৫ ডলারের কাছাকাছি।
কোন কোন দেশের মানুষ বেশি কফি পান করে
ফিনল্যান্ডের অধিবাসীরা গড়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কফি পান করে থাকে -তথ্য আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা। এছাড়াও নরওয়ে ও আইসল্যান্ডে মানুষের কফি গ্রহণের পরিমাণ বছরে গড়ে ৯ কেজির ওপর এবং ডেনমার্ক ও সুইডেনে গড়ে ৮ কেজি।
কফিশপের দিক থেকে প্রথম হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে কফির দোকান। যেগুলোকে ‘কাহভেহ খানে’ বলা হতো। কফির এইসব দোকানগুলোই পরবর্তীতে জনপ্রিয়তা লাভ করে প্রতিদিনের আড্ডা, জমায়েতের জায়গা হিসেবে।
বর্তমানে কফিশপে সাধারণত লাটে, এসপ্রেসো, ডাবল এসপ্রেসো, লং ব্ল্যাক মাকিয়াটো, ক্যাপেচিনো, মকা, ফ্ল্যাট হোয়াইট, অ্যামেরিকানোসহ পাওয়া যায় নানান স্বদের কফি।
কফি সম্পর্কে তো অনেককিছুই জানলাম, এবার এর উপকারীতাও জেনে নেই?
কফি পানের উপকারিতা
১. কফিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা মানব শরীরের ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিকের মিশ্রণ রোধে সাহায্য করে।
২. অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়, অতিরিক্ত এক কাপ কফি বাড়াতে পারে মানুষের আয়ু।
৩. মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে যারা হৃদরোগ এবং পাকস্থলীর রোগে ভুগছেন। এক গবেষণায় জানা গেছে, হার্ট অ্যাটাক সহ অনেক জটিল রোগের সম্ভাবনা কমিয়ে আনতে দিনে তিন কাপ কফি পান করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। এ গবেষণাটি ১৬ বছর ধরে ৫ লাখ ইউরোপীয় মানুষের ওপর চালানো হয়।
৪. যারা বাড়তি ওজনের চিন্তা করছেন, তারা কফির সঙ্গে দুধ-চিনি না মিশিয়ে শুধু ‘র’ কফি পানের চেষ্টা করুন, উপকার পাবেন।
৫. শরীর সুস্থ রাখতে কফিতে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বেশ কাজ করে। এছাড়াও কফি পুষ্টিমানে সমৃদ্ধ হওয়ায় স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
তবে অতিরিক্ত কফি পানে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে-
১. সকালে কিছু না খেয়ে যদি খালি পেটে কফি পান করেন তাহলে পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। আর এই অ্যাসিডের পরিমাণ পাকস্থলীতে বেশি হলে হজমে সমস্যা হতে পারে।
২. হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড বেশি হলে পাকস্থলীর গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করে আলসার, গ্যাস্ট্রিকের মতো সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
৩. এছাড়া কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় বাধা তৈরি হতে পারে। এটি শরীরে কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে কিন্তু স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
৪. ব্রিটিশ স্বাস্থ্যতথ্য মতে, প্রতিটি গর্ভবতী মহিলা দিনে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি কফি (ফিলটার কফি এক মগ পরিমাণ বা ইনস্ট্যান্ট কফি দুই মগ) পান করা উচিত নয়।
তাই অতিরিক্ত কফি পানের অভ্যাস না করে দিনে তিন কাপ কফিতেই সন্তুষ্ট থাকুন।
Civet cat coffee

