খতিয়ান কি?
খতিয়ান হলো সরকারের খাজনা আদায়ের মাধ্যম। কার কাছে কতটুকু সম্পত্তি রয়েছে, ভূমির ধরণ বা প্রকৃতি কেমন, কার কাছে কতটুকু খাজনা পাবে তার সবকিছুই সরকার খতিয়ান দেখে জেনে নেয়।
খতিয়ান হলো ভূমির মালিকানার আইনি রেকর্ড, যা ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি যা ভূমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। বাংলাদেশে খতিয়ান ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম মৌলিক নথি হিসেবে গণ্য করা হয়।
খতিয়ান একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ “হিসাব”, এবং এটি জমি চিহ্নিত করার জন্য একটি দলিল। ভূমি মন্ত্রণালয় অনুযায়ী, এটি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত হয় দখল, মালিকানা নির্ধারণ, এবং ভূমি উন্নয়ন কর মূল্যায়নের জন্য। এটি রেকর্ড অফ রাইটস, সোত্তলিপি, বা পোরচা হিসেবেও পরিচিত, তবে এটি মালিকানার দলিল নয়, বরং দখলের অধিকারের রেকর্ড। বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট, ১৮৮৫ এবং স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ এর অধীনে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
খতিয়ান দুই ধরনের হয়। যথা-
ক) রেকর্ডিং বা জরিপ খতিয়ান
খ) নামজারি খতিয়ান।
১. রেকর্ডিং ও জরিপ খতিয়ানের প্রকারভেদ- CS, SA, RS, BS

▶ CS (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) খতিয়ান
ভারত উপমহাদেশের সর্বপ্রথম জরিপ খতিয়ান হলো CS খতিয়ান। ১৮৮৯- ১৯৪০ সাল পর্যন্ত এই জরিপটি হয়েছে করা হয়েছিল।
CS খতিয়ান চেনার উপায়
এই খতিয়ানে দুটি পাঠ বা বিবরণী রয়েছে। উপরের পাঠটিতে সেই সময়ে জমিদার বা মালিকানার বিবরণ থাকবে আর নিচে প্রজা বা দখলদারদের বিবরণ থাকবে। তাছাড়া দুই পৃষ্ঠা মিলে CS খতিয়ান হয়ে থাকে। এবং আন্ডারলাইনগুলো লম্বালম্বিভাবে থাকবে। তাছাড়া এই খতিয়ানের উপরের অংশে পরগনা কথাটি লেখা থাকবে। এই খতিয়ান ৪০-এর রেকর্ড নামেও পরিচিত।
▶ SA (সাট পর্চা) খতিয়ান
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি সরকার ক্ষমতায় আসলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির হয়ে যায়। পরে ১৯৫৬ সাল হতে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি সরকার SA জরিপটি করে। এটিকে অনেক জায়গায় ৬২-এর রেকর্ড নামেও পরিচিত।
SA খতিয়ান চেনার উপায়
SA খতিয়ানের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খতিয়ানের বামপাশের একদম উপরে সাবেক এবং নিচে হাল লেখা থাকবে। সাবেক বরাবর ডানপাশে CS খতিয়ানের রেফারেন্স এবং হাল বরাবর ডানপাশে SA খতিয়ানের নাম্বার থাকবে। তাছাড়া SA খতিয়ান সবসময় এক পৃষ্ঠার হয়ে থাকে।
▶ RS (রিভিশনাল সেটেলমেন্ট) খতিয়ান
এটি হলো বাংলাদেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ খতিয়ান। কেননা, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই সরকার এই খতিয়ান তৈরি করেন। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এ খতিয়ান কার্যকর ছিল।
RS খতিয়ান চেনার উপায়
RS খতিয়ান এখন অনেক জায়গায় প্রিন্টেট হয়। আর যদি প্রিন্টেট হয়, তাহলে উপরে স্পষ্ট করে RS খতিয়ান লেখা থাকবে। এটিও CS খতিয়ানের মত দুই পৃষ্ঠা মিলে হবে এবং আন্ডারলাইনগুলো লম্বালম্বিভাবে থাকবে। তবে এই খতিয়ান চেনার এর একটি উপায় হলো ডানপাশে উপরে রেসার্ভে নং দিয়ে একটা নাম্বার থাকবে।
▶ BS (বাংলাদেশ সেটেলমেন্ট) খতিয়ান
এই খতিয়ান চেনা খুবই সহজ। এটিকে সিটি জরিপ খতিয়ানও বলা হয়। তবে ঢাকার বাহিরে BS খতিয়ান নামে পরিচিত। এটি ১৯৯৯/২০০০ সাল থেকে বর্তমান সাল পর্যন্ত চালু রয়েছে।
BS খতিয়ান চেনার উপায়
এই খতিয়ান অবশ্যই প্রিন্টেট হবে। এ খতিয়ানে যত লেখা থাকবে সবই প্রিন্টেট হবে। এবং উপরে স্পষ্ট সীল দিয়ে লেথা থাকবে ঢাকা সিটি জরিপ লেখা থাকবে। ঢাকার বাহিরে হলে BS খতিয়ান লেখা থাকবে। অনেকে আবার এটিকে BRS বলে থাকেন। এটি নাকি RS খতিয়ানের পরে হয়েছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটি অবশ্যই প্রিন্টেট এবং সব লেখাই প্রিন্টেট হবে। আর ঢাকার ভিতরে হলে সীল দেয়া থাকবে। তাছাড়া প্রিন্টেটের তারিখটা অবশ্যই ২০০০ সালের পরে হবে।
▶ ডি এস খতিয়ান:
নতুন চর ভূমি অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত, যা নদী ভাঙন ও জমির পরিবর্তন নির্দেশ করে।
চরাঞ্চলের ভূমি সংক্রান্ত মামলা বা বিরোধে বেশি ব্যবহৃত হয়।
▶ সিটি জরিপ:
ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত, মহানগর এলাকায় ব্যবহৃত।
ভূমির বর্তমান অবস্থা ও মালিকানার আপডেটেড রেকর্ড থাকে।
২. নামজারি খতিয়ান
এই খতিয়ান চেনার সহজ উপায় হলো খতিয়ানের ডানপাশে কেস নং দেয়া থাকবে এবং তার উপরে জোত নং দেয়া থাকবে। এক পৃষ্ঠায় হয় এবং এটিও লম্বালম্বিভাবে দাঁড়ি টানা তাকে।
খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত বিষয়সূমহ
খতিয়ানে কি কি বিষয় অন্তর্ভূক্ত করতে হবে সে সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় অর্জন বিধিমালার ১৮ নম্বর বিধিতে বিবৃত করা হয়েছে। এ বিধি অনুযায়ী নিম্ন লিখিত বিবরণসূমহ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
১. খতিয়ানে অবশ্যই প্রজা বা খলদারের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।
২. প্রজা বা দখলদার কোন শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।
৩. প্রজা বা দখলদার কতৃক অধিকৃত জমির অবস্থান শ্রেণী, পরিমান ও সীমানা।
৪. প্রজার জমির মালিকের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা
৫. এষ্টেটের মালিকের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।
৬. খতিয়ান প্রস্তুতের সময় খাজনা এবং ২৮,২৯,৩০ বিধি মোতাবেক নির্ধারিত খাজনা।
৭. গোচরণ, ভূমি, বনভূমি ও মৎস্য খামারের জন্য ধারণকৃত অর্থ।
৮. যে পদ্ধতিতে খাজনা ধার্য করা হয়েছে তার বিবরণ।
৯. যদি খাজনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে তাহলে যে সময়ে ও যে পদক্ষেপে বৃদ্ধি পায় তার বিবরণ।
১০. কৃষি কাজের উদ্দেশ্যে প্রজা কতৃক পানির ব্যবহার এবং পানি সরবরাহের জন্য যন্ত্রপাতি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কিত প্রজা ও জমির মালিকের মধ্যে অধিকার ও কর্তব্যের বিবরণ।
১১. প্রজাস্বত্ব সম্পর্কিত বিশেষ শর্ত ও তার পরিণতি।
১২. পথ চলার অধিকার ও জমি সংলগ্ন অনান্য ইজমেন্টের অধিকার।
১৩. নিস্কর জমি তার বিবরণ।
১৪. ২৬ নং ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত ও ন্যায়সঙ্গত খাজনা।
এছাড়া একটি খতিয়ানে তার নিজস্ব খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, বাট্টা নম্বর, এরিয়া নম্বর, মৌজা নম্বর ও জে এল নম্বর থাকে।
এছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে খতিয়ান পেতে ভিজিট করুন https://eporcha.gov.bd/
এক নজরে
| প্রকার | বর্ণনা |
| সি.এস. খতিয়ান | ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত প্রস্তুত, প্রথম জরিপের ফলাফল। |
| এস.এ. খতিয়ান | ১৯৫০-এর পর প্রস্তুত, রাজ্য অধিগ্রহণ ও দখল আইনের পর, কিছু এলাকায় আর.এস. হিসেবেও পরিচিত। |
| আর.এস. খতিয়ান | সংশোধনী জরিপ, এস.এ. খতিয়ানের ভুল সংশোধনের জন্য, কিছু এলাকায় বি.এস. হিসেবেও পরিচিত। |
| বি.এস. খতিয়ান/সিটি জরিপ | ১৯৯৮-৯৯ থেকে চলমান, শহরী এলাকার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত। |
খতিয়ানের গুরুত্ব:
খতিয়ান ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কিছু মূল গুরুত্ব নিম্নরূপ:
ক) ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ:
- খতিয়ানের মাধ্যমে ভূমির প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করা যায়।
- এটি ভূমি মালিকদের জন্য একটি বৈধ মালিকানার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
খ) আইনি সুরক্ষা:
- ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এড়াতে ও আদালতে উপস্থাপনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
- ভূমি দখল বা অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে।
গ) ভূমি কর নির্ধারণ:
- সরকার ভূমি কর আদায়ের জন্য খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করে।
- ভূমির প্রকৃত পরিমাণ এবং ব্যবহার অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা হয়।
ঘ) ভূমি হস্তান্তর ও ক্রয়-বিক্রয়:
- ভূমি বিক্রি, দান বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে খতিয়ানের তথ্য অপরিহার্য।
- নির্ভরযোগ্য খতিয়ান না থাকলে জমির লেনদেন আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে।
ঙ) উন্নয়ন পরিকল্পনা:
- সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন ভূমি পরিকল্পনার জন্য খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করে।
- শহর ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এটি সহায়ক।
চ) ঋণ গ্রহণের জন্য সহায়ক:
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষি বা হাউজিং ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে খতিয়ান প্রয়োজন।
- এটি ভূমির আইনি বৈধতা নিশ্চিত করে, যা ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সহায়ক।
ছ) ভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা:
- ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- সরকারি ও ব্যক্তিগত ভূমির ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয়।
জ) উত্তরাধিকার ও জমির বণ্টন:
- জমির উত্তরাধিকার নির্ধারণে খতিয়ান একটি নির্ভরযোগ্য নথি।
- পারিবারিক বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে এটি সহায়তা করে।
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় খতিয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি যা মালিকানা নির্ধারণ, বিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমি কর আদায় এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সময় ভূমি জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে ভূমি মালিকদের আইনি অধিকার সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

