নামজারি খতিয়ান বা Mutation Khatian হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন মালিকের নাম সরকারি ভূমি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো ব্যক্তি জমি ক্রয় করলে, উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে, দান বা হেবা গ্রহণ করলে কিংবা আদালতের রায়ের মাধ্যমে মালিকানা লাভ করলে সেই পরিবর্তিত মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করাকে নামজারি বলা হয়। বাংলাদেশে এটি অনেক সময় “খারিজ” নামেও পরিচিত। নামজারির মাধ্যমে সরকার জমির প্রকৃত মালিক শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা করে।
নামজারি খতিয়ান বাতিল করতে
বাংলাদেশে কোনো নামজারি খতিয়ান (Mutation Khatian) ভুলভাবে তৈরি হলে, জালিয়াতির মাধ্যমে হলে, বা প্রকৃত মালিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সেটি বাতিল বা সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত এই কাজটি সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা ভূমি আপিল বোর্ডের মাধ্যমে করা হয়।
নামজারির মূল উদ্দেশ্য
নামজারির মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করে—
- জমির প্রকৃত মালিক কে
- কে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) প্রদান করবে
- ভবিষ্যতে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের বৈধতা
- সরকারি রেকর্ডে মালিকানার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
নামজারি খতিয়ান বাতিলের সাধারণ কারণ
নিচের কারণে নামজারি বাতিলের আবেদন করা যায়ঃ
- জাল দলিল বা ভুয়া কাগজে নামজারি হওয়া
- প্রকৃত মালিককে না জানিয়ে নামজারি করা
- উত্তরাধিকার ভুল দেখানো
- দাগ, খতিয়ান বা জমির পরিমাণ ভুল
- আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নামজারি হওয়া
- একই জমি অন্যের নামে খারিজ হওয়া
- প্রতারণামূলক বা Fraudulent Entry হওয়া
নামজারি খতিয়ান কেন গুরুত্বপূর্ণ
১. সরকারি মালিকানার রেকর্ড: জমি কেনার পর শুধু দলিল করলেই সম্পূর্ণ নিরাপদ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। সরকারি খতিয়ানে নাম অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
২. খাজনা পরিশোধের জন্য প্রয়োজন: নামজারি ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিজের নামে খাজনা দেওয়া যায় না।
৩. ভবিষ্যতে জমি বিক্রির সুবিধা: নামজারি না থাকলে পরবর্তীতে জমি বিক্রি, ব্যাংক ঋণ বা হস্তান্তরে সমস্যা হয়।
৪. জমি বিরোধ কমায়: সঠিক নামজারি থাকলে মালিকানা নিয়ে বিরোধ তুলনামূলক কম হয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে নামজারি করতে হয়
নিচের পরিস্থিতিতে সাধারণত নামজারি প্রয়োজন হয়—
- জমি ক্রয় করলে
- উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে
- হেবা/দান পেলে
- আদালতের রায়ের মাধ্যমে মালিকানা পেলে
- জমি বণ্টন বা ভাগ হলে
- কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নামে জমি হস্তান্তর হলে
নামজারি খতিয়ান বাতিল করার ধাপসমূহ
১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ
প্রথমে নিচের কাগজগুলো প্রস্তুত করতে হবে—
- বর্তমান নামজারি খতিয়ানের কপি
- মূল খতিয়ান (এসএ, আরএস, বিএস ইত্যাদি)
- দলিলের কপি
- পর্চা/খাজনার রসিদ
- ওয়ারিশ সনদ (যদি উত্তরাধিকার বিষয় হয়)
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- আদালতের রায় (যদি থাকে)
- জালিয়াতির প্রমাণ বা আপত্তির দলিল
২. এসিল্যান্ড অফিসে “মিস কেস” দায়ের
যে উপজেলায় জমি অবস্থিত, সেই উপজেলার ভূমি মন্ত্রণালয় অধীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে “মিস মামলা” বা Miscellaneous Case করতে হয়।
এখানে আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হবেঃ
- কোন খতিয়ান বাতিল চান
- কেন বাতিল চান
- কীভাবে ভুল বা প্রতারণা হয়েছে
- প্রকৃত মালিকানা কার
আইনগতভাবে এটি SAT Act 1950 এর ধারা ১৪৩ এবং Tenancy Rules 1955 এর Rule 23 অনুযায়ী করা হয়।
৩. তদন্ত ও শুনানি
আবেদন গ্রহণের পর—
- ইউনিয়ন ভূমি অফিস তদন্ত করবে
- মাঠ পর্যায়ে যাচাই হবে
- সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নোটিশ দেওয়া হবে
- শুনানি অনুষ্ঠিত হবে
এই পর্যায়ে উভয় পক্ষ তাদের কাগজপত্র ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারে।
৪. এসিল্যান্ডের সিদ্ধান্ত
তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে—
- নামজারি ভুল হয়েছে,
- জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে,
- বা আইনগত ত্রুটি আছে,
তাহলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি বাতিল বা সংশোধনের আদেশ দিতে পারেন।
এরপর নতুন সংশোধিত খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।
যদি এসিল্যান্ড আবেদন খারিজ করে
তাহলে আপিল করা যায়ঃ
| ধাপ | কোথায় আপিল |
|---|---|
| ১ম আপিল | অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) |
| ২য় আপিল | বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) |
| চূড়ান্ত আপিল | ভূমি আপিল বোর্ড |
সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। (Prothomalo)
আদালতে মামলা করার সুযোগ
যদি বিষয়টি জটিল মালিকানা বিরোধ হয়, তাহলে—
- দেওয়ানি আদালতে Title Suit
- Declaration Suit
- Injunction মামলা
করতে হতে পারে।
বিশেষ করে জাল দলিল বা মালিকানা বিরোধ থাকলে আদালতের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

কত সময় লাগে?
সাধারণত—
- সহজ সংশোধন: ৩০–৪৫ দিন
- জটিল বিরোধ: কয়েক মাস বা তার বেশি
সময় লাগতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- শুধু মৌখিক অভিযোগে কাজ হয় না, লিখিত প্রমাণ প্রয়োজন।
- জমি সংক্রান্ত বিরোধে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া ভালো।
- জাল দলিল থাকলে ফৌজদারি মামলাও করা যায়।
- অনলাইনে নামজারি তথ্য যাচাই করা উচিত।

