ইসবগুল বা Isabgol, স্বাস্থ্য সচেতনতায় একটি পরিচিত নাম। এর উপকারিতার কথা আমরা সকলেই জানি। খাবারটি যারা একবার খেয়েছেন, তারাই এর সম্পর্কে বিস্তর প্রশংসা করতেই পারবেন।
ইসবগুলের ভুসি বলে যাকে জানি, সেটা কোন ফুল বা ফল নয়। এটি মূলত গুল্ম জাতীয় গাছের বীজের খোসা থেকে প্রস্তুতকৃত। যা সাধারণত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বীজ থেকে আলাদা করা হয়ে থাকে।
এর আদি আবাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। তবে বর্তমানে স্পেন, উত্তর আফ্রিকা, চীন, পাকিস্তানের কিছু অঞ্চল, ভারত এবং বাংলাদেশেও চাষ হচ্ছে।
ইসবগুল এক ধরনের রবিশস্য। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত যখন বৃষ্টি থাকে না, তখন এর চাষ হয়ে থাকে। অর্থাৎ যখন ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা এই ফসল চাষের জন্য উপযুক্ত।

এর গাছগুলো দেড় থেকে দুই ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। আর ফলগুলো হয় দুই কোষবিশিষ্ট। যা সাধারণত সাত-আট মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এই ফলগুলোর ভেতরে তিন মিলিমিটারের মত লম্বা বীজ থাকে। বীজগুলো দেখতে অনেকটা নৌকার মতো আর খোসার মাধ্যে পিচ্ছিল মিউসিলেজ বা শ্লেষ্মা থাকে।
দেশের বাহিরে একে Psyllium husk বলে থাকে। Psyllium husk শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ psylla থেকে। যার অর্থ এক ধরনের ডানাহীন ফ্লি—মাছি। ইসবগুলের বীজ দেখতে অনেকটা ফ্লি—মাছির মতো। যে কারণে ইংরেজিতে এটিকে Psyllium husk বলে। আবার একে blond plantain-ও বলেন অনেকে।
আর ইসবগুল শব্দটা এসেছে ফারসি শব্দ ‘ইসপা-গোল’ থেকে। যার অর্থ ‘ঘোড়ার কান’। খোসাগুলো আকারে এতোই ছোট যে কাছ থেকে বোঝা না গেলেও,যদি বড় করা যায়, তাহলে এগুলোকে দেখতে অনেকটা ঘোড়ার কানের মতো মনে হবে। উচ্চারণে এটি ‘ইসবগুল’ হলেও বানানে কিন্তু ‘ইসবগুল’।
বর্তমানে বিশ্বে যে কটি প্রজাতি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়, সেগুলো হলো ফ্রান্সের কালো বীজ প্ল্যান্ট্যাগো ইন্ডিকা (Plantago indica), স্পেনীয় প্ল্যান্ট্যাগো সিলিয়াম (Plantago psyllium) ও ভারতীয় সাদাটে বীজ প্ল্যান্ট্যাগো ওভাটা (Plantago ovata)।
বীজ প্রক্রিয়ার পদ্ধতি
এক ধরনের সূক্ষ্ম ও জটিল কাজ হলো বীজ থেকে খোসা আলাদা করা । অতীতে জাঁতাকলে খোসা ছাড়ার কাজটি করা হতো।
তবে বর্তমানে আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন-
- ১. ফ্লুইড এনার্জি মিল
- ২. বল মিল
- ৩. ভাইব্রেটিং মিল
- ৪. পিন মিল।
১. ফ্লুইড এনার্জি মিল
ফ্লুইড এনার্জি মিলের প্রকোষ্ঠে খুবই দ্রুত বেগে স্টিম বা বায়ু চালিত করা হয়। যার ফলে বীজে বীজে ঠোকাঠুকি লেগে আর বীজ থেকে খোসা আলাদা হয়ে যায়।
২. বল মিল
বল মিলে বীজের সাথে পাথর বা ধাতব বল মিশিয়ে ঘোরানো হয়। যার ফলে বীজের সাথে পাথরের ঠোকাঠুকি লেগে আর বীজ থেকে খোসা আলাদা হয়ে যায়।
৩. ভাইব্রেটিং মিল
ভাইব্রেটিং মিলে অতিরিক্ত কম্পন সৃষ্টি করা হয়। যার ফলে বীজে বীজে ঠোকাঠুকি লেগে আর বীজ থেকে খোসা আলাদা হয়ে যায়।

৪. পিন মিল
পিন মিল হলো এগুলোর মাঝে বহুল ব্যবহৃত হলো। এ মিলের দুটো চাকাতেই অজস্র পিন চক্রাকারে লাগানো থাকে। এ মিলের চাকাগুলো বিপরীত গতিতে ঘুরে ঘুরে কাজ করে। ঘোরার সময় দুই পাশের পিনে ইসবগুলের বীজগুলো ঠোকা খায় আর বীজ থেকে খোসা আলগা হয়ে যায়।
প্রতিটি মিলের কাজই হলো খোসা আলাদা করা। আর সব পদ্ধতিরই প্রধান লক্ষ্য হলো খোসা উৎপাদন করতে গিয়ে যেন বীজ ভেঙে না যায়।
শত চেষ্টার পরও মিলগুলোতে কিছু না কিছু বীজ ভেঙে যায়। যেগুলো আলাদা করা হয় চালুনি দিয়ে। এখানে খুব সাবধানে হালকা বাতাসে খোসাগুলোকেও ওড়ানো হয়। এটা অনেকটা কুলো দিয়ে ধান ওড়ানোর মত। অর্থাৎ যেভাবে কুলো দিয়ে ধান থেকে খড়কুটো ধুলাবালু আলাদা করা হয়। আর এভাবেই প্রতিটি মিলে কাজ চলে।
ইসবগুলের সম্বন্ধে তো অনেকটাই জানলাম এবার জানব এর উপকারিতা
উপকারিতা
কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে
কোষ্ঠকাঠিন্যে কমবেশি অনেক মানুষেই ভোগেন বা ভুগছেন। মানুষের বিভিন্ন কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। যেমন- খাদ্যাভ্যাসের দরুন, ওষুধ খাওয়া, দীর্ঘ যাত্রায় বহুক্ষণ এক স্থানে অনড় বসে থাকা। এছাড়া গর্ভবতী মায়েদেরও এ সমস্যা দেখা দেয়। আর রমজানে খাবারের অনিয়ম বেশি হয়, যে কারণে সমস্যাও বেড়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ইসবগুলের ভুসি খাওয়া যেতে পারে। ইসবগুলের ভুসি পেটের বর্জ্য বের করে দিতে সাহায্য করে। যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে যায়।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে
বর্তমানে চিকিৎসকরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূরে রাখে
আমাদের দেশে গ্যাস্ট্রিক যেন একটি সাধারণ সমস্যা। ভুসি রিফ্লাক্স রোগ বা খাদ্যনালির প্রদাহ কমাতে বেশ কার্যকারী। এ রোগের উপসর্গ হলো খাওয়ার পর পেট-বুক জ্বালাপোড়া করা ও পেটে গ্যাস হওয়া।
এই ভুসি পাকস্থলীর গায়ে একটি অবারণ সৃষ্টি করে। যার ফলে এসিডের ক্ষতি হতে শরীরকে এবং পাকস্থলীর দেওয়ালকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার ফলে শর্করা জাতীয় খাবার শরীরে কম শোষিত হয়। ফলে পরোক্ষভাবে হলেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এটি সহায়তা করে থাকে।
আমাশয় প্রতিরোধে সহায়তা করে
রাতে ঘুমানোর আগে যাদের ভুসি খাওয়ার অভ্যাস আছে, তাদের আমাশয় হওয়ার সম্ভবনা কম। কেননা এটি পেট পরিষ্কারের কাজ করে থাকে।
ওষুধ খেলে আমাশায় ভাল হয় আর জীবাণুগুলো পেটের ভেতরে মরে যায়। তবে শরীর থেকে বের হয় না। এর ফলে আমাশায় রোগে আবারও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে ইসবগুলের ভুসি আমাশয়ের জীবাণুকে বের করে দিতে সহায়তা করে। ইসবগুল আবার আমাশয়ের জীবাণু ধ্বংস করতে পারে না।
হার্ট সুস্থ রাখে
ইসবগুলের ভুসিতে ফাইবার থাকায় তা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে কাজ করে। এর ফলে হৃদ্রোগ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। খাদ্য থেকে কোলেস্টেরল শোষণেও এটি বাধা দেয়। তাই এটি নিয়মিত খেলে হার্ট থাকে সুস্থ।
হজমে সাহায্য করে
ফাইবার জাতীয় খাবার আমাদের খাবার হজমে ব্যাঘাত ঘটায়। এক্ষেত্রে ইসবগুল বেশ সহায়ক। কেননা, ফাইবার জাতীয় খাবার হজমে ইসবগুল ওষুধের থেকে বেশি কাজ করে।
এছাড়াও ডায়রিয়া, অর্শ, মূত্র প্রদাহ, রক্তে কোলেস্টেরল কমাতে, মূত্র স্বল্পতা, কোলন ক্যান্সার এবং দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসজাতীয় রোগেও অনেক উপকারী।
পুষ্টি উপাদান
ইসবগুলে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ১ টেবিল চামচ ইসবগুলে রয়েছে- ১৫ গ্রাম শর্করা, ৫৩ শতাংশ ক্যালোরি, ৩০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম ও ০.৯ মিলিগ্রাম আয়রন।
কীভাবে খাবেন
তাহলে জেনে নেয়া যাক, কোন রোগে কীভাবে খাবেন ইসবগুল-
- ১. খাদ্যনালির প্রদাহে যারা ভুগছেন তারা যদি ১ গ্লাস ঠান্ডা পানির সঙ্গে ২ চা চামচ ইসবগুল ভিজিয়ে খান তাহলে ভাল উপকার পেতে পারেন।
- ২. আমাশয়ে যদি রোগীরা সকালে ও রাতে একগ্লাস ইসবগুলের শরবত খায়, তবে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
- ৩. ডায়রিয়ায় যদি দইয়ের সঙ্গে সবগুলো খাওয়া যায়, তবে বেশ কাজে দেয়। কেননা, এটি প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে।
- ৪. যারা দীর্ঘদিন কোষ্ঠকঠিন্যতায় ভুগছেন তারা নিয়মিত ১ গ্লাস কুসুম গরম দুধের সাথে ২ চামচ ইসবগুল মিশিয়ে খাবেন ঘুমানোর আগে। আর এভাবে প্রায় ২ মাস খেলে উপকার পাবেন। তবে পেট যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে সপ্তাহে ১-২ দিনের বেশি না খাওয়াই ভালো।
- ৫. কুসুম গরম পানিতে ২ চামচ ইসবগুলের ভুসি ও সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে যদি ভাত খাবার আগে খাওয়া যায়, তবে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের বেশ উপকারে আসবে।
এছাড়াও অন্য ওষুধের সাথে পথ্য হিসেবেও ইসবগুল খাওয়া যেতে পারে। কেননা, এর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলেই চলে।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া
যদিও এটি খুব প্রাকৃতিক একটি খাবার এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর অতি ব্যবহার শরীরের জন্য হানিকারক হতে পারে।
১. যাদের অতিমাত্রায় কোষ্ঠকাঠিন্য রয়েছে তারা ২ মাসের মত খেলেই উপকার পাবেন। তবে এরপর নিয়মিত খাওয়া ঠিক হবে না। যদি খান, তবে ডায়ারিয়ার মত সমস্যায় ভুগতে পারেন।
ওষুধ আমাদের পেটকে কেমিক্যালাইস করে, কিন্তু ইসবগুলের ভুসি আমাদের প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ রাখে।
কিনতে এখানে ক্লিক করুন।
ইসবগুলের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা, ইসবগুলের ভুসি কেন খাবেন, ইসুবগুলের ভুসি খাওয়ার উপকারিতা, ইসবগুলের ভুসির ৫ উপকারিতা, ইসুবগুলের ভুসি খেলে কী হয়?, উপকারী ইসবগুল, ইসবগুলের ভুসি কেন খাবেন
আরো দেখেুন
এলাচের যত গুণ, জানলে অবাক হবেন



